শৈলশহরে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়! শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পৌঁছাতে লাগছে ৭ ঘণ্টা, লাগামছাড়া গাড়িভাড়া
নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি: একদিকে স্কুল-কলেজে গরমের ছুটি, অন্যদিকে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে হাঁসফাঁস গরম। আর এই তীব্র দহনজ্বালা থেকে রেহাই পেতে চাতক পাখির মতো পাহাড়ের দিকে ছুটছেন পর্যটকেরা। সিকিমের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের শৈলশহর দার্জিলিং এবং ডুয়ার্সের জঙ্গল ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটনস্থলগুলিতে এই মুহূর্তে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। তবে উপরি পাওনা হিসেবে পর্যটকদের কপালে জুটছে মাইলের পর মাইল যানজট এবং পকেট কাটার মতো লাগামছাড়া গাড়িভাড়া।
৩ ঘণ্টার পথ ৭ ঘণ্টায়, ঘুম থেকে দার্জিলিং পেরোতেই কালঘাম
স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে খবর, গত কয়েকদিন ধরে পাহাড়মুখী ট্যুরিস্টদের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, পাহাড়ি পথে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে গাড়ির লম্বা লাইন পড়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যে পথ গাড়িতে মাত্র তিন ঘণ্টায় অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায়, তীব্র যানজটের জেরে এখন সেখানে সময় লাগছে প্রায় সাত ঘণ্টা। বারাসতের বাসিন্দা অপূর্ব দাস পাহাড়ে গিয়ে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, “ঘুম (Ghum) থেকে দার্জিলিং— এই মাত্র ৬ কিলোমিটার পথ পেরোতেই আমাদের গাড়িতে দু’ঘণ্টার বেশি সময় লেগে গিয়েছে। এর আগে একাধিকবার পাহাড়ে এলেও এমন অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি।”
এনজেপি থেকে পাহাড়ের ভাড়া ছুলো ৭ হাজার, চালকদের মনগড়া যুক্তি
পর্যটকদের এই বিপুল ঢলকে হাতিয়ার করে এক শ্রেণির গাড়ি চালক সিন্ডিকেট রাজ ও লাগামছাড়া ভাড়া হাঁকাচ্ছেন বলে ভুরিভুরি অভিযোগ উঠছে। দেখা যাচ্ছে, নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) স্টেশন থেকে যেখানে দার্জিলিং যাওয়ার জন্য স্বাভাবিক গাড়ি রিজার্ভেশন ভাড়া ছিল তিন হাজার টাকা, এখন সেখানে নেওয়া হচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। আর দার্জিলিং থেকে ফেরার পথে কোনো পর্যটক যদি মিরিক (Mirik) হয়ে এনজেপি নামতে চান, তবে তাঁর কাছ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে।
নৈহাটির বাসিন্দা শালিনী ঘোষ জানান, সাত জনের দল নিয়ে এনজেপি থেকে দার্জিলিং পৌঁছাতে তাঁদের ৭ ঘণ্টা সময় লাগার পাশাপাশি ৬ হাজার টাকা গাড়িভাড়া গুণতে হয়েছে। যদিও নিউ জলপাইগুড়ি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের পক্ষে বিজয় রাউত দাবি করেছেন, “তেলের দাম বৃদ্ধি ও দীর্ঘ যানজটের কারণে কিছুটা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলেও ৫-৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়। বাইরের কোনো গাড়ি যদি এই টাকা নিয়ে থাকে, তবে তাতে আমাদের হাত নেই।”
হোটেল ১০০ শতাংশ বুকড, পা ফেলার জায়গা নেই ম্যালে
দার্জিলিংয়ের লোয়ার তুমসুং রোডের এক হোটেল মালিক জীবন নন্দী জানান, এই মুহূর্তে ম্যালে কার্যত পা ফেলার জায়গা নেই। সমস্ত হোটেল ও হোমস্টে ১০০ শতাংশ বুকড। রুম না থাকায় অনেক সময় পর্যটকদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে এবং এই বুকিং আগামী ১০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল জানান, দার্জিলিংয়ে সমস্ত হোটেল মিলিয়ে মাত্র দু’হাজারের মতো রুম রয়েছে, অথচ গ্যাংটকে এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ফলে ধারণক্ষমতা বা পরিকাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি পর্যটক একসঙ্গে চলে আসার কারণেই এই চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
একই চিত্র ডুয়ার্সেও (Dooars)। ডুয়ার্স ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব জানান, লাটাগুড়ি ও মূর্তি সহ ডুয়ার্সের সমস্ত জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলির রিসর্ট ও হোটেলে এই মুহূর্তে ৮০ শতাংশেরও বেশি রুম বুকড হয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে গরমের ছুটিতে পাহাড় ও ডুয়ার্স হাসলেও, ট্রাফিক জ্যাম ও ভাড়ার চক্করে পর্যটকদের পকেটে ভালোই টান পড়ছে।