কয়লা পাচার মামলায় ইডির বড় ঝটকা, বাজেয়াপ্ত ১৬০ কোটির সম্পত্তি!
বর্তমান ডেস্কঃ
পশ্চিমবঙ্গের আলোচিত কয়লা পাচার মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ফের বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক অভিযানে সংস্থাটি প্রায় ১৬০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছে। ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেড (ইসিএল)-এর খনি এলাকা থেকে বেআইনিভাবে কয়লা উত্তোলন ও পাচারের এই দীর্ঘকালীন তদন্তে এটি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির খতিয়ান ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি
তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন করে ১৫৯ কোটি ৫১ লক্ষ টাকার সম্পত্তি ‘প্রভিশনাল অ্যাটাচমেন্ট’ বা সাময়িকভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এর ফলে এই মামলায় এখন পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হওয়া মোট সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮২ কোটি ২২ লক্ষ টাকায়। এবারের বাজেয়াপ্ত তালিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- বিভিন্ন সুবিধাভোগী সংস্থার নামে থাকা কর্পোরেট বন্ড।
- বিকল্প কিছু আর্থিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত নথি।
- একাধিক বেসরকারি সংস্থার বিনিয়োগ।
সিন্ডিকেটের কার্যক্রম ও অর্থপাচারের কৌশল
ইডির দাবি অনুযায়ী, অনুপ মাজি ওরফে লালার নেতৃত্বে এই বিশাল সিন্ডিকেটটি গড়ে উঠেছিল। ইসিএল-এর লিজ নেওয়া এলাকা থেকে অবৈধভাবে কয়লা তুলে তা রাজ্যের বিভিন্ন কারখানায় সরবরাহ করা হতো। তদন্তে উঠে এসেছে যে, বেশ কিছু সংস্থা জেনে-বুঝে এই চোরাই কয়লা নগদে কিনত। এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাকে পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে বিনিয়োগ করে ‘বৈধ’ করার চেষ্টা চালানো হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাচারের অভিনব পদ্ধতি ও প্রশাসনের ভূমিকা
তদন্তে কয়লা পাচারের একটি অত্যন্ত চতুর ও বিস্ময়কর কৌশলের হদিশ মিলেছে, যা ‘লালা প্যাড’ নামে পরিচিত। পাচারের জন্য ব্যবহৃত ট্রাক বা ডাম্পারগুলো নির্বিঘ্নে পার করার জন্য প্রযুক্তির সঙ্গে চিরাচরিত কৌশলের মিশ্রণ ঘটানো হতো।
- টাকার নোটের সংকেত: ট্রাকের নম্বর প্লেটের পাশে ১০ বা ২০ টাকার একটি নোট ধরে ছবি তোলা হতো।
- হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহার: সেই ছবি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও প্রশাসনের নির্দিষ্ট স্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এই সংকেত দেখার পর রাস্তায় থাকা কোনো চেকপোস্টে গাড়িগুলোকে আর আটকানো হতো না।
- হাওয়ালা নেটওয়ার্ক: ব্যাংকিং লেনদেন এড়িয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আদান-প্রদানের জন্য হাওয়ালা পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। সেখানেও কারেন্সি নোটের সিরিয়াল নম্বর মিলিয়ে কোনো নথি ছাড়াই নগদ লেনদেন সম্পন্ন হতো।
প্রভাব ও পরবর্তী পদক্ষেপ
ইডি-র এই পদক্ষেপে স্পষ্ট যে, কয়লা পাচারের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের মদত ছাড়া এই বিশাল নেটওয়ার্ক চালানো আসাম্ভব ছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। বর্তমানে ইডি ওই দুই বেসরকারি সংস্থা এবং কয়লা কেনার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সুবিধাভোগীদের ওপর কড়া নজর রাখছে। আগামী দিনে এই আর্থিক লেনদেনের উৎস ধরে আরও বড় কোনো রাঘববোয়ালের নাম সামনে আসে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এক নজরে
- বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি: প্রায় ১৬০ কোটি টাকা (১৫৯.৫১ কোটি)।
- মোট বাজেয়াপ্ত: ৪৮২.২২ কোটি টাকা।
- প্রধান অভিযুক্ত: অনুপ মাজি ওরফে লালা।
- মূল কৌশল: ‘লালা প্যাড’ ও টাকার নোটের ছবি ব্যবহার করে পাচার।
- আর্থিক লেনদেন: নগদ কেনাবেচা ও হাওয়ালা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থপাচার।