বাংলায় গেরুয়া সুনামি: ধূলিসাৎ ঘাসফুলের দুর্গ, ধরাশায়ী অরূপ-ব্রাত্যসহ একঝাঁক হেভিওয়েট মন্ত্রী

বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল রাজ্যবাসী। সোমবার সকালে ব্যালট পেপার গণনার শুরু থেকেই যে ট্রেন্ড দেখা গিয়েছিল, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যত গেরুয়া সুনামিতে রূপ নিয়েছে। প্রাথমিক বুথ ফেরত সমীক্ষাকে ছাপিয়ে ২০০-র বেশি আসন নিয়ে বাংলায় সরকার গড়তে চলেছে বিজেপি। এই ঝড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি যেমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ে পরাজিত হয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমোর অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একঝাঁক হেভিওয়েট মন্ত্রী।

খড়কুটোর মতো উড়ল তৃণমূলের ‘গড়’

রাজ্যের বিদায়ী মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যদের পরাজয় এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক। দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ, যা অরূপ বিশ্বাসের খাসতালুক হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেও ভাঙন ধরেছে। বিজেপির পাপিয়া দে অধিকারীর কাছে ৬ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন অরূপ বিশ্বাস। উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর কেন্দ্রে প্রয়াত অজিত পাঁজার উত্তরাধিকারী শশী পাঁজা পরাস্ত হয়েছেন বিজেপির পূর্ণিমা চক্রবর্তীর কাছে। ব্যবধান প্রায় ১৪ হাজারেরও বেশি। এমনকি রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু দমদম কেন্দ্রে ২৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছেন বিজেপির অরিজিৎ বক্সীর কাছে। এই হার তৃণমূলের শহরকেন্দ্রিক ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ধসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জেলায় জেলায় ধরাশায়ী তৃণমূলের সেনাপতিরা

কেবল কলকাতা বা শহরতলি নয়, জেলাগুলোতেও বিজেপির দাপটে ধরাশায়ী হয়েছেন তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতারা। উত্তরবঙ্গের দিনহাটায় তিনবারের বিধায়ক উদয়ন গুহ পরাজিত হয়েছেন বিজেপির অজয় রায়ের কাছে। একই ছবি দেখা গিয়েছে বিধাননগর ও শিল্পাঞ্চলেও। বিধাননগরের দাপুটে নেতা সুজিত বসু ৩৭ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন। আসানসোল উত্তরে মলয় ঘটক এবং সবংয়ের বর্ষীয়ান নেতা মানসরঞ্জন ভুঁইয়াও জয়ের মুখ দেখতে পাননি। সিঙ্গুরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় বেচারাম মান্না এবং চন্দননগরে ইন্দ্রনীল সেনের পরাজয় ঘাসফুল শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পরাজয়ের কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া এবং মন্ত্রী ও বিধায়কদের বিরুদ্ধে স্থানীয় স্তরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভই এই গণধসের প্রধান কারণ। বিশেষ করে হেভিওয়েট মন্ত্রীদের নিজের এলাকায় হার প্রমাণ করে যে, সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে জনমত পরিবর্তনের ঢেউ অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। এই ফলাফলের ফলে বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে যেতে চলেছে। তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনকালের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি সরকার গঠন করায় রাজ্যের নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মূলত গ্রামীণ ও শহরতলি—উভয় অঞ্চলেই বিজেপির নিরঙ্কুশ আধিপত্য রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *