সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়! ‘এসআইআরে নাম বাদ মানেই বিদেশি নয়’, বড় স্বস্তি পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের লক্ষাধিক মানুষের

নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়া দিল্লি: ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া মানেই কোনো ব্যক্তি বিদেশি বা অনাগরিক নন। এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ার বা ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। বিহারের বহুল চর্চিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) সংক্রান্ত মামলায় এক যুগান্তকারী রায়ে এই বড় কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সহ গোটা দেশের লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ বড়সড় স্বস্তি পেলেন। তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পরেই পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে এবার বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া বৈধ, কিন্তু নাগরিকত্ব কাড়ার অধিকার নেই

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ ১২৪ পাতার এই ঐতিহাসিক রায় প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা ৪৯ দিনের শুনানি শেষে গত ২৯ জানুয়ারি এই মামলার রায় স্থগিত (Reserve) রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এদিনের রায়ে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ বা ‘এসআইআর’ করার পুরো অধিকার রয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ও বৈধ।

তবে এর সঙ্গেই আদালত কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ পড়া মানেই তিনি বিদেশি, এমন সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। নাগরিকত্ব বিচারের আইনি ক্ষমতা কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষেরই রয়েছে।

৪ সপ্তাহের মধ্যে তালিকা পাঠানোর নির্দেশ

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, যাঁদের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় নেই, নির্বাচন কমিশনকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে সেই তালিকা ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন মোতাবেক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক) কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। আগামী দিনে যেকোনো নির্বাচনের আগেই এই কর্তৃপক্ষকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে বাদ পড়া ব্যক্তিরা উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সহ পুনরায় নাম তোলার জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং সরকারকে সন্তুষ্ট করতে পারলে ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম উঠবে।

বঙ্গের নতুন সরকারের প্রকল্প বন্ধের নীতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মূলত বিহারের মামলার প্রেক্ষিতে হলেও, এর বড় প্রভাব পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছে যে, এসআইআর-এ যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে কিংবা যাঁরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন, তাঁরা রাজ্যের সামাজিক বা সরকারি প্রকল্পের (যেমন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার ইত্যাদি) সুবিধা পাবেন না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।

ভোটের ফলাফলে প্রভাবের দাবি সৌগত ও সিংভির

এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তৃণমূলের লোকসভা সাংসদ সৌগত রায় বলেন, “রাজ্য সরকারের এই নির্দেশ সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অমানবিক। সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেখানে বলছে ভোটার তালিকায় নাম বাদ মানেই কেউ বিদেশি নয়, সেখানে রাজ্য সরকার কীভাবে ভারতীয় নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে পারে?” তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাড়াহুড়ো করে লক্ষাধিক নাম বাদ দিয়ে ভোটের আগে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ৩১টি আসনে এসআইআর-এ বাদ পড়া নামের সংখ্যার চেয়ে জয়ের মার্জিন কম ছিল।

অনুরূপ সুর চড়িয়ে প্রবীণ আইনজীবী তথা কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ অভিষেক মনু সিংভি মন্তব্য করেন, “নাগরিকত্ব বিচারের ক্ষমতা কমিশনের নেই, অথচ সেই তকমা দিয়েই নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে তো ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশ নাম পুনরায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ভোটের আগে এই আইনি বিষয়গুলি স্পষ্ট হলে নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হতেই পারত।” আদালতের এই রায়ের পর নতুন রাজ্য সরকার তাদের প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে কিনা, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *