মহাগণনার মহারণ ২০২৬: ৫ রাজ্যের রায় আজ, অগ্নিপরীক্ষায় বাংলার অস্তিত্ব ও দিল্লির দাপট
আজ ৪ মে, ২০২৬। দীর্ঘ ৫০ দিনের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক টানাপড়েন, প্রশাসনিক রদবদল এবং আড়াই লক্ষ আধাসেনার কড়া পাহারায় সম্পন্ন হওয়া মহাযুদ্ধের ফলাফল প্রকাশের দিন। ১৫ মার্চ নির্বাচনি নির্ঘণ্ট ঘোষণার মাধ্যমে যে মহাযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল, আজ তার পূর্ণাহুতি। দেশের পাঁচ রাজ্য— পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির মোট ৮২৩টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভাগ্যপরীক্ষায় অবতীর্ণ ৮ হাজার ৯০৪ জন প্রার্থী। তবে গোটা দেশের নজর এখন পূর্ব ভারতের দিকে— বাংলার মসনদে শেষ পর্যন্ত কে বসছে, তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এক নজরে ৫ রাজ্যের নির্বাচনি পরিসংখ্যান
| রাজ্য/অঞ্চল | মোট আসন | মোট প্রার্থী | প্রধান প্রতিপক্ষ |
| পশ্চিমবঙ্গ | ২৯৪ (গণনা ২৯৩) | ২,৯২৬ | তৃণমূল বনাম বিজেপি বনাম বাম-কংগ্রেস |
| অসম | ১২৬ | নির্ধারিত | বিজেপি জোট বনাম কংগ্রেস জোট |
| তামিলনাড়ু | ২৩৪ | নির্ধারিত | ডিএমকে বনাম এআইএডিএমকে |
| কেরল | ১৪০ | নির্ধারিত | এলডিএফ বনাম ইউডিএফ |
| পুদুচেরি | ৩০ | নির্ধারিত | এনআর কংগ্রেস জোট বনাম ইউপিএ |
বাংলার লড়াই: বাঙালির অস্তিত্ব বনাম দিল্লির আধিপত্য
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনটি কেবল একটি সাধারণ সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়, এটি কার্যত একটি মর্যাদার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। একদিকে রয়েছে বিজেপির পুরো রাষ্ট্রশক্তি— প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেখানে বঙ্গ বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রচারের যাবতীয় ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি একাই লড়ছেন বাঙালির ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ জন্য।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে এবার নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ ছ’মাস ধরে SIR (Site Inspection & Retrieval) প্রক্রিয়ার নামে সাধারণ ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হয়রানি করা এবং কয়েক হাজার প্রশাসনিক আধিকারিককে রাতারাতি বদলি করার ঘটনাকে অনেকেই ‘তুঘলকি শাসন’ হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ ব্যালট বক্সে প্রতিফলিত হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।
গণনাকেন্দ্রে ‘বজ্র আঁটুনি’: নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়
রাজ্যের ৭৭টি গণনাকেন্দ্রে আজ যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে বিরল। ত্রিস্তরীয় এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিন্যাস নিম্নরূপ:
- প্রথম স্তর (বাইরের পরিধি): গণনাকেন্দ্রের প্রবেশপথে থাকবেন রাজ্য পুলিশের লাঠিধারী বাহিনী ও সার্জেন্টরা।
- দ্বিতীয় স্তর (মধ্যবর্তী বলয়): এখানে পুলিশ এবং আধাসেনা যৌথভাবে মোতায়েন থাকবে।
- তৃতীয় স্তর (অন্তঃপুর): স্ট্রংরুমের ঠিক বাইরে এবং গণনাকক্ষের নিকটতম বলয়ে থাকবে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ানেরা।
বিএনএস-এর ১৬৩ ধারা: গণনাকেন্দ্রের ২০০ মিটার এলাকার মধ্যে বিএনএস (BNS)-এর ১৬৩ ধারা (পূর্বতন ১৪৪ ধারা) জারি করা হয়েছে। কোনোভাবেই কোনো জমায়েত বরদাস্ত করা হবে না।
প্রযুক্তির প্রয়োগ: এবারই প্রথম কাউন্টিং এজেন্টদের পরিচয়পত্রে কিউআর কোড (QR Code) যুক্ত করা হয়েছে। কোনো এজেন্টই কমিশনের সার্ভারে থাকা তথ্যের সঙ্গে মিল না পাওয়া পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে এই প্রবেশের প্রক্রিয়া শেষ করার ডেডলাইন দেওয়া হয়েছে।
গণনা প্রক্রিয়ার সময়রেখা ও ধাপসমূহ
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী গণনা প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ কিন্তু সময়সাপেক্ষ করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ফল ঘোষণা হতে অনেকটা দেরি হতে পারে।
- সকাল ৮:০০টা – পোস্টাল ব্যালট: প্রথমে সিল করা ট্রাঙ্ক থেকে পোস্টাল ব্যালট বের করা হবে। এর গণনা চলবে সম্পূর্ণ আলাদা কক্ষে।
- সকাল ৮:৩০টা – ইভিএম গণনা: কন্ট্রোল ইউনিটগুলো গণনা টেবিলে আনা শুরু হবে। প্রতিটি আসনে ন্যূনতম ১৪ রাউন্ড গণনা বাধ্যতামূলক। বিধানসভার আয়তন অনুযায়ী তা সর্বোচ্চ ২৮ রাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।
- ট্যাবুলেশন ও ভেরিফিকেশন: প্রতি রাউন্ডের ফলাফল হাতে আসার পর তা সরাসরি ট্যাবুলেশন টেবিলে যাবে। সেখানে রিটার্নিং অফিসার (RO) এবং অবজার্ভারের সই না হওয়া পর্যন্ত কোনো তথ্য বাইরে লিক করা যাবে না।
- কমিশনের সবুজ সংকেত: প্রতি রাউন্ডের ডেটা স্ক্রিনশট তুলে সরাসরি দিল্লির দপ্তরে পাঠাতে হবে। সেখান থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর তবেই পরবর্তী রাউন্ডের ইভিএম খোলা হবে।
উপনির্বাচনের ফলাফল ও অন্যান্য
বাংলার পাশাপাশি আজ দেশের একাধিক বিধানসভার উপনির্বাচনের ফলাফলও ঘোষিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে:
- কর্ণাটকের বাগালকোট ও দেবনাগরে-দক্ষিণ।
- ত্রিপুরার ধর্মনগর।
- মহারাষ্ট্রের বারামতী (জাতীয় রাজনীতিতে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ) ও রাহুরি।
- গুজরাটের উমরেত এবং গোয়ার পণ্ডা।
অপেক্ষার প্রহর: কার ভাগ্যে কী?
পশ্চিমবঙ্গের ২,৯২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে আজ ভাগ্য খুলবে মাত্র ২৯৩ জনের। ফলতা কেন্দ্রে আগামী ২১ মে পুনরায় ভোট হওয়ার কথা থাকায় সেই ফলাফল আজ জানা যাচ্ছে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জন্য বাংলাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলার সাধারণ মানুষের হয়রানি কি শাসক দলের প্রতি সহানুভূতি বাড়িয়েছে, নাকি পরিবর্তনের হাওয়া দিল্লির পালে হাওয়া দিয়েছে—তার উত্তর মিলবে আজ দুপুরের পর।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গত ছ’মাসের লড়াই এবং মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস কি তাঁকে নবান্নে চতুর্থবারের মতো (বা পুনরায়) ফিরিয়ে আনবে? নাকি দিল্লির দাপটে ফিকে হয়ে যাবে ঘাসফুলের রং? উত্তরের অপেক্ষায় এখন গোটা দেশ।