মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আমূল পরিবর্তন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষতিপূরণ দাবি ও মার্কিন ডলারের ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির বোঝা এবার ওয়াশিংটনের কাঁধে চাপাতে চাইছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে হওয়া বিপুল আর্থিক ক্ষতির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকস্টপ’ বা আর্থিক নিরাপত্তা বলয় এবং গ্যারান্টি দাবি করেছে আবুধাবি। এই দাবি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য এবং ডলারের একচেটিয়া বাজারের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

যুদ্ধ ও পুনর্গঠনের আকাশছোঁয়া ব্যয়

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের গড় খরচ হচ্ছে ৮৯০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার। ইসরায়েল প্রথম ২০ দিনেই খরচ করেছে ৬.২ বিলিয়ন ডলার, যা এখন ১১.২ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। তবে যুদ্ধের চেয়েও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও অবকাঠামো মেরামতে প্রয়োজন অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই তেল ও গ্যাস খাতের জন্য বরাদ্দ করতে হবে।

ক্ষতির মুখে আরব আমিরাত ও ডিজিটাল অবকাঠামো

আমিরাতের অবকাঠামোয় যুদ্ধের আঘাত বেশ গুরুতর। দুবাইয়ের বিখ্যাত ‘দ্য ফেয়ারমন্ট দ্য পাম’ হোটেল এবং ফুজেয়রা তেল টার্মিনাল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া আমাজনের দুটি ডেটা সেন্টার ধ্বংস হওয়ায় পুরো অঞ্চলের ব্যাংকিং ক্লাউড পরিষেবা এবং কম্পিউটিং ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। হরমোজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় আমিরাতের ডলার আয়ের প্রধান উৎসও বন্ধের পথে। এই প্রেক্ষাপটে আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান খালিদ মোহাম্মদ বালামা মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কাছে ‘কারেন্সি সোয়াপ’ বা মুদ্রা বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল ও পাল্টা চ্যালেঞ্জ

অতীতে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে সৌদি আরব ও কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এবার যুদ্ধের খরচ মেটাতে আরব দেশগুলোর কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু আমিরাতের এই পাল্টা দাবি পুরো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আবুধাবি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষতির ভার যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আমিরাতের এই পথ অনুসরণ করে কাতার বা সৌদি আরবও যদি ক্ষতিপূরণ চায়, তবে ওয়াশিংটন চরম আর্থিক ঝুঁকিতে পড়বে।

ডলার বনাম ইউয়ান ও ইরানের বিশাল দাবি

আমিরাত ইতিমধ্যে তেলের লেনদেনে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’ ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি। এদিকে ইরানও বসে নেই; তারা ইউএই, সৌদি আরব ও কাতারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। পাশাপাশি হরমোজ প্রণালীতে নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ থেকে টোল আদায়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছে তেহরান, যা তাদের মাসে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয়ের পথ খুলে দেবে।

একঝলকে

  • ইউএই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্থিক গ্যারান্টি বা নিরাপত্তা বলয় দাবি করেছে।
  • যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক খরচ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার এবং ইসরায়েলের মোট খরচ ১১ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে।
  • উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো মেরামতে অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
  • দুবাইয়ের হোটেল, তেল টার্মিনাল এবং আমাজনের ডেটা সেন্টার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
  • তেল বাণিজ্যে ডলারের বদলে চীনা ইউয়ান ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে আরব আমিরাত।
  • প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইরান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *