বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া, নবান্ন দখলের পথে বিজেপি এবং তৃণমূলের বিপর্যয়ের নেপথ্যে ৫ কারণ
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় পরিবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত মিলছে। বর্তমান নির্বাচনী ট্রেন্ড অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে প্রথমবারের মতো নবান্ন দখলের পথে অগ্রসর হচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। প্রাথমিক ফলাফল ও গণনার ধারা বলছে, ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্ট্রি’ বা ভূমিধস জয়ের দিকে এগোচ্ছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু ঠিক কী কারণে তৃণমূলের মতো শক্তিশালী দলের এই বিপর্যয় এবং কেন ফিকে হয়ে গেল ‘মমতা ম্যাজিক’? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে প্রধান পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করছেন।
হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ ও ভোট মেশিনারি অচল
নির্বাচনী ময়দানে এবারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ধর্মীয় মেরুকরণ বা হিন্দু-মুসলিম ন্যারেটিভ। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি অনুযায়ী, ‘হিন্দু ইভিএম’ বনাম ‘মুসলিম ইভিএম’-এর যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে ভোটবাক্সে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের কঠোর নজরদারি এবং রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে তৃণমূলের তথাকথিত ‘ভোট মেশিনারি’ এবার অচল হয়ে পড়েছে। ছাপ্পা বা রিগিংয়ের অভিযোগ থেকে মুক্ত পরিবেশে ভোট হওয়ায় শাসকদল বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও দুর্নীতির প্রভাব
ভোটের আগে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া তৃণমূলের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রাজ্য জুড়ে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, যা সরাসরি শাসকদলের ভোটব্যাংকে আঘাত হেনেছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সারদা, নারদা এবং শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির (TET) মতো ইস্যুগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। কোনো বড় শিল্প না আসা এবং কর্মসংস্থানের অভাবের ফলে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া বা ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ এবার তৃণমূলকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
অন্তর্দ্বন্দ্ব ও রেকর্ড ভোটদান
তৃণমূলের অন্দরে দীর্ঘদিনের পুরোনো কর্মী বনাম নতুন নেতাদের সংঘাত বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিচুতলার কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। পুরোনো কর্মীদের একাংশ নিষ্ক্রিয় থাকায় বা বিক্ষুব্ধ হয়ে ভোট না দেওয়ায় দলগত সংহতি নষ্ট হয়েছে। এছাড়া, এবার দুই দফাতেই প্রায় ৯৩ শতাংশের বেশি রেকর্ড ভোটদান লক্ষ্য করা গেছে। এই বিপুল জনজোয়ার যে আসলে পরিবর্তনের পক্ষে এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ছিল, তা নির্বাচনী ফলেই স্পষ্ট। মূলত দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং মেরুকরণের রাজনীতির সম্মিলিত প্রভাবেই বাংলা আজ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সাক্ষী হতে চলেছে।