টালিগঞ্জে ২০ বছরের বিশ্বাসের গড় চুরমার, বিজেপির তারকা প্রার্থীদের জয়ে নতুন সমীকরণ

দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতির চেনা ছক ওলটপালট করে দিয়ে শিরোনামে উঠে এলেন বিজেপির একঝাঁক তারকা প্রার্থী। টালিগঞ্জ থেকে যাদবপুর কিংবা শিবপুর থেকে শ্যামপুর—তৃণমূলের আধিপত্য ম্লান করে গেরুয়া শিবিরের অভিনেতা-প্রার্থীদের এই জয়জয়কার বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে এক নতুন ধারার জন্ম দিল। দীর্ঘ দুই দশক পর টালিগঞ্জের মতো শক্ত ঘাঁটি হাতছাড়া হওয়া এবং হেভিওয়েট প্রার্থীদের পরাজয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও চমকে দিয়েছে।

টালিগঞ্জ ও যাদবপুরে বড় অঘটন

সবচেয়ে বড় চমক দেখা গিয়েছে টালিগঞ্জ কেন্দ্রে। অরূপ বিশ্বাসের মতো তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতাকে ৬,০১৩ ভোটে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী। জয়ের পর উচ্ছ্বসিত পাপিয়া জানান, এটি টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ার দমবন্ধ করা পরিবেশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের রায়। অন্যদিকে, বাম রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু যাদবপুরেও ফুটেছে পদ্ম। সিপিআই-এর বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ও তৃণমূলের দেবব্রত মজুমদারকে ২৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বড় জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন শর্বরী মুখোপাধ্যায়। এই ফল প্রমাণ করেছে যে যাদবপুর আর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া দুর্গ নয়।

হাওড়া ও সোনারপুরে পদ্ম-ঝড়

হাওড়ার শিবপুর কেন্দ্রে ১৬,০৫৮ ভোটে জয়ী হয়ে চমক দিয়েছেন রুদ্রনীল ঘোষ। গত নির্বাচনের ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে শিবপুরের মাটি কামড়ে পড়ে থাকা রুদ্রনীলের দাবি, উন্নয়নের তৃষ্ণা থেকেই মানুষ ব্যালটে জবাব দিয়েছেন। সোনারপুর দক্ষিণে বিজেপি নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের জয়ের ব্যবধানও চোখে পড়ার মতো (৩৫,৭৮২)। রূপার মতে, এই জয়ের কারিগর মূলত এলাকার মহিলারা, যাঁরা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে ভোট দিয়েছেন। পাশাপাশি শ্যামপুরে হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায় ওরফে হিরণ এবং আসানসোল দক্ষিণে অগ্নিমিত্রা পলের জয় বিজেপির শক্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

পরিবর্তনের কারণ ও আগামীর প্রভাব

তৃণমূলের পুরোনো ও প্রভাবশালী প্রার্থীদের হটিয়ে তারকা প্রার্থীদের এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘদিনের চেনা মুখের পরিবর্তে নতুন মুখ ও গ্ল্যামারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেমন কাজ করেছে, তেমনই শাসকদলের বিরুদ্ধে থাকা প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা বা অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টরকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। এই জয়ের ফলে বিধানসভায় যেমন টলিউড বা সাংস্কৃতিক জগতের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে, তেমনই দক্ষিণবঙ্গের তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। বিশেষ করে টালিগঞ্জ ও যাদবপুরের মতো কেন্দ্র হাতছাড়া হওয়া শাসকদলের ভবিষ্যৎ সংগঠনের জন্য একটি অশনি সংকেত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *