ইরান যুদ্ধে চিনের মাস্টারস্ট্রোক ও সংকটে মার্কিন অর্থনীতি
ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কেবল রণক্ষেত্রের স্থিতাবস্থা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে এক বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সংঘাতের আবহে পর্দার আড়ালে সবচেয়ে লাভজনক চালটি চেলেছে চিন। তেহরান ও বেজিংয়ের এই যৌথ কৌশলে দীর্ঘদিনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন ডলারের আধিপত্য এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে।
ডলারের একাধিপত্য ও চিনের চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের তেলের বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন এখনও মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ইরান এখন ডলারের বিকল্প খুঁজতে মরিয়া। হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের শক্ত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইরান ও চিন আন্তর্জাতিক লেনদেনে চিনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-কে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এই পদক্ষেপ সফল হলে বিশ্ব বাজারে ডলারের চাহিদা কমবে এবং মার্কিন অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেজিং ও তেহরানের কৌশলগত জোট
ইরান ও চিনের এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা উভয় দেশের জন্যই বিশেষ সুবিধাজনক হিসেবে দেখা দিচ্ছে:
- মার্কিন আধিপত্য খর্ব: ডলার বর্জন করলে আমেরিকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা কমে যাবে, যা ইরানের জন্য বড় স্বস্তি।
- ইউয়ানের উত্থান: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে চিনের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং এটি ‘গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি’ হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।
- ব্যবসায়িক ছাড়: ইরান বর্তমানে তাদের মোট তেল রফতানির ৮০ শতাংশই চিনে পাঠায়। ডলারের বদলে ইউয়ানে লেনদেন হওয়ায় চিন বিশেষ ছাড়ে তেল কেনার সুযোগ পাচ্ছে। বিনিময়ে ইরান চিন থেকে বিপুল পরিমাণ ভারী যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম আমদানি করছে।
হরমুজ প্রণালী ও তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা
তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকারী সংস্থা ‘কেপলার’ এবং ‘ট্যাঙ্কার ট্র্যাকারস’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধের ডামাডোলে ইরানের তেল সরবরাহে কোনো বড় বিঘ্ন ঘটেনি। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেও ইরান প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ব্যারেল তেল রফতানি করেছে, যার গন্তব্য ছিল মূলত চিন। হরমুজ প্রণালীর টোল বুথগুলোতেও ইউয়ানে লেনদেনের প্রক্রিয়া শুরু করার মাধ্যমে ইরান বার্তা দিয়েছে যে, তারা মার্কিন মুদ্রার ওপর নির্ভরশীলতা কাটাতে প্রস্তুত।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও পেট্রোইউয়ানের ভবিষ্যৎ
চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবে গড়ে তোলা। সম্প্রতি জিম্বাবোয়েতে ইরানি দূতাবাস থেকে ‘পেট্রোইউয়ান’ চালুর যে দাবি তোলা হয়েছে, তা এই লক্ষ্যপূরণেরই একটি অংশ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি জ্বালানি তেলের বাজার থেকে ডলার সরতে শুরু করে, তবে তা আমেরিকার বিশ্বজুড়ে খবরদারি করার ক্ষমতায় বড় আঘাত হানবে।
একঝলকে
- বিশ্ব তেলের বাজারের ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে হলেও এখন ইউয়ানে ঝোঁক বাড়ছে।
- ইরানের তেলের সিংহভাগ (প্রায় ৮০ শতাংশ) একাই কিনছে চিন।
- হরমুজ প্রণালীতে আধিপত্য বজায় রেখে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ছে তেহরান।
- চিন ও ইরানের এই ‘উইন-উইন’ মডেল মার্কিন অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সস্তায় জ্বালানি ও পণ্য আদান-প্রদানই লক্ষ্য।