আমেরিকা ইরান যুদ্ধবিরতির নেপথ্যে চিনের মাস্টারস্ট্রোক এবং নেপথ্যের নাটকীয় ১০ ঘণ্টা
মধ্যপ্রাচ্যে ঘনিয়ে আসা যুদ্ধের কালো মেঘ শেষ পর্যন্ত কেটেছে। দীর্ঘ উত্তেজনার পর আমেরিকা ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারি এবং ইরানের অনড় অবস্থানের মাঝে এই নাটকীয় পরিবর্তন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। তবে এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব পাকিস্তান দাবি করলেও, পর্দার আড়ালের প্রকৃত কারিগর হিসেবে উঠে আসছে চিনের নাম।
ট্রাম্পের হুমকি ও নাটকীয় ১০ ঘণ্টা
মঙ্গলবার পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে যুদ্ধের আশঙ্কা অনিবার্য হয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, যুদ্ধবিরতি না হলে এক রাতের মধ্যেই একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এর পাল্টা জবাবে ইরান আমেরিকার সাথে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক ১০ ঘণ্টা আগে শুরু হয় কূটনৈতিক তৎপরতা। শেষ পর্যন্ত ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দিতে রাজি হয়।
পাকিস্তানের কৃতিত্ব ও ঘনীভূত রহস্য
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বিবৃতিতে পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে শেহবাজ শরিফের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট। যেখানে ড্রাফট মেসেজ পোস্ট হওয়ায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, পাকিস্তানের হয়ে অন্য কোনো দেশ এই কূটনীতি পরিচালনা করছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাকিস্তান কেবল একটি বার্তা বাহক বা মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
চিনের নীরব কূটনীতি ও প্রভাব বিস্তার
বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনার মূল কারিগর বেজিং। যুদ্ধের শুরু থেকে চিন নীরব থাকলেও শেষ মুহূর্তে সরাসরি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি বদলে যায়।
- নিরাপত্তা পর্ষদে কৌশল: যুদ্ধবিরতির ঠিক আগে চিন ও রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পর্ষদে ইরানের বিরুদ্ধে একটি সামরিক প্রস্তাব আটকে দেয়।
- সরাসরি যোগাযোগ: চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই এই সংকটের সমাধানে ইরান, ইজরায়েল ও রাশিয়ার সঙ্গে অন্তত ২৬ বার ফোনে কথা বলেছেন।
- ইরানের ওপর প্রভাব: পাকিস্তানের তুলনায় ইরানের ওপর চিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
কেন চিনের ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমের কাছে চিনের জড়িত থাকার কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করলেও সরকারি বিবৃতিতে তার উল্লেখ নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বিশ্বমঞ্চে চিনের আধিপত্য স্বীকার না করার কৌশল হিসেবেই পাকিস্তানকে সামনে রাখা হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আসার পেছনে বেজিংয়ের এই ‘সাইলেন্ট ডিপ্লোম্যাসি’ বড় ভূমিকা পালন করেছে।
একঝলকে
- আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত।
- বিতর্কিত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে রাজি হয়েছে ইরান।
- চিনের সরাসরি হস্তক্ষেপে ১০ ঘণ্টার মধ্যে বদলে যায় যুদ্ধের পরিস্থিতি।
- আমেরিকা কৃতিত্ব দিচ্ছে পাকিস্তানকে, তবে নেপথ্যে রয়েছে চিনের কূটনীতি।
- তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস।