বিপ্লব দেবের ‘ত্রিপুরা মডেল’ এবার বাংলায়, সংখ্যালঘু দুর্গে পদ্ম শিবিরের অভাবনীয় উত্থান

নয়াদিল্লি: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতিতে এক বড়সড় পটপরিবর্তন ঘটিয়ে দিল ভারতীয় জনতা পার্টি। বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনগুলিতে বিজেপির অভাবনীয় সাফল্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চমকে দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যন্ত শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের ৪৯টি সংবেদনশীল আসনের মধ্যে ২৬টিতেই জয়ী হয়েছে বিজেপি। এই সাফল্যের নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে উঠে আসছে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান নেতা বিপ্লব দেবের নাম।

সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কেও ফাটল

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ৪৯টি আসনের মধ্যে ২৩টি আসনেই সংখ্যালঘু জনসংখ্যার হার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা ছিল, এই ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের একচ্ছত্র দখলে থাকবে। তবে ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি এই ৪৯টির মধ্যে ২৬টি আসনে জয়লাভ করেছে, যেখানে তৃণমূলের ঝুলি গিয়েছে মাত্র ২১টি আসন। কংগ্রেস জিতেছে মাত্র দুটি আসনে। উল্লেখ্য, এই ২৬টি জয়ের মধ্যে ২৫টি আসনই বিজেপি সরাসরি তৃণমূলের থেকে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি যেখানে দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৮টি পেয়েছিল, সেখানে ২০২৬-এ বিপ্লব দেবের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই এলাকাগুলিতে দলের পারফরম্যান্স সাংগঠনিক স্তরে বড় চমক হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাম দুর্গ ভাঙার কৌশলে তৃণমূল স্তরে থাবা

বিপ্লব দেবের এই সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল বামপন্থীদের একসময়ের শক্তিশালী ক্যাডার নেটওয়ার্ককে নিজেদের অনুকূলে আনা। ত্রিপুরায় দীর্ঘ ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটানোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বাংলায় ‘দুর্ভেদ্য’ তৃণমূল নেটওয়ার্ক ভাঙার ছক কষেন। সূত্রের খবর, কলকাতা, যাদবপুর এবং দুই ২৪ পরগনার মতো এলাকায় তিনি প্রাক্তন বাম নেতাদের সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক করেন। তৃণমূলের ওপর ক্ষুব্ধ বাম কর্মী-সমর্থকদের বিজেপির পতাকাতলে আনাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তৃণমূল স্তরের বা বুথ লেভেলের কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং তাঁদের অভাব-অভিযোগ শোনাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা ও মহিলা নিরাপত্তাকে হাতিয়ার

নির্বাচনী প্রচারে বিপ্লব দেব মূলত রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক হিংসা এবং মহিলাদের নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে রেখেছিলেন। প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে তাঁর শাণিত আক্রমণ বামপন্থী ভোটারদের একাংশকে প্রভাবিত করেছে। বিজেপি নেতৃত্বের মতে, বামেরা দুর্বল হয়ে পড়ায় যে ভোটাররা বিকল্প খুঁজছিলেন কিন্তু কংগ্রেসকে ভোট দিতে চাননি, তাঁদের বড় অংশই বিপ্লব দেবের কৌশলে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। ত্রিপুরায় যেভাবে তিনি মিসড কল মেম্বারশিপের মাধ্যমে সংগঠন গড়েছিলেন, ঠিক সেই ধাঁচেই বাংলায় বুথ ও মণ্ডল স্তরে সংগঠনের কঙ্কালসার দশা সারিয়ে তুলে দলকে এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *