তৃণমূলের দুর্গে ধস: ১৫ বছরের শাসনের অবসানে যে ৫টি কারণ দায়ী

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। দীর্ঘ ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার পর পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ পেতে হলো মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে। যদিও দলীয় নেতৃত্ব এই পরাজয়কে ‘নির্বাচন কমিশনের কারসাজি’ এবং ‘ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া’র ফল হিসেবে দাবি করছেন, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনমতের ধরনে উঠে এসেছে শাসক শিবিরের বিপর্যয়ের নেপথ্যে থাকা পাঁচটি অমোঘ কারণ।

নারী ভোটব্যাংকে ফাটল ও দুর্নীতির পাহাড়

তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘকালীন সাফল্যের প্রধান স্তম্ভ ছিল রাজ্যের নারী ভোটাররা। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বা ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্প নারী মনে মমতার যে স্থায়ী আসন তৈরি করেছিল, তাতে প্রথম বড় আঘাত লাগে আরজি কর কাণ্ডের জেরে। নারী সুরক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা এবং রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘অভয়া’র বিচারের আন্দোলন তৃণমূলের এই দুর্ভেদ্য দুর্গে ফাটল ধরিয়েছে। এর সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে পানিহাটির মতো আসনে, যেখানে আরজি করের নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বড় জয় পেয়েছেন।

পাশাপাশি, দেড় দশকের শাসনে দুর্নীতির অভিযোগ তৃণমূলকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। নিয়োগ দুর্নীতি, কাটমানি এবং সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে জনমানসে যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, ভোটের বাক্সে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে বেকার ভাতা চালু করেও কর্মসংস্থানহীন যুবসমাজের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে বিদায়ী সরকার।

ভোটার তালিকা সংশোধন ও মেরুকরণের সমীকরণ

এবারের নির্বাচনে ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন তৃণমূলের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়ায় শাসক দল সাংগঠনিকভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিজেপির অভিযোগ ছিল, ভুয়া ভোটারদের ওপর ভিত্তি করেই তৃণমূল বছরের পর বছর নির্বাচনী সুবিধা নিয়েছে; ফলাফল প্রকাশের পর সেই দাবির সত্যতা অনেকাংশেই প্রমাণিত।

অন্যদিকে, রাজ্যের ভোট রাজনীতির দীর্ঘদিনের সমীকরণ ছিল মুসলিম ভোটব্যাংক। কিন্তু এবার তার বিপরীতে হিন্দু ভোটের তীব্র মেরুকরণ বা ‘কনসলিডেশন’ লক্ষ্য করা গেছে। মমতা ব্যানার্জী মন্দির নির্মাণ বা ‘সফট হিন্দুত্ব’ দিয়ে এই মেরুকরণ ঠেকানোর চেষ্টা করলেও ভোটাররা শেষ পর্যন্ত বিজেপিকেই বেছে নিয়েছেন। এমনকি মালদহ বা মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম প্রধান জেলাতেও বিজেপি তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রভাব ও বাস্তবতা

অভূতপূর্ব কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি এবং নির্বাচন কমিশনের কঠোরতায় এবার শাসক দল কোনো বাড়তি প্রশাসনিক সুবিধা পায়নি। ফলে স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরাজয়ের ফলে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটল এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যে পদ্ম শিবির ক্ষমতা দখলের পথে এগিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *