কলকাতায় জলযন্ত্রণা কেন? সামান্য বৃষ্টিতেই কেন ভাসে তিলোত্তমা, জানালেন বিশেষজ্ঞরা
কলকাতা ও শহরতলিতে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজপথে জল জমে যাওয়া এখন এক পরিচিত ছবি। সন্ধ্যকালীন এক পশলা বৃষ্টিতেই জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার পেছনে শুধুমাত্র নিকাশী ব্যবস্থার ত্রুটি নয়, বরং শহরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আমাদের নাগরিক উদাসীনতাও সমানভাবে দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভৌগোলিক দিক থেকে কলকাতা গঙ্গা বদ্বীপের একটি নিচু সমতল অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে বৃষ্টির জল প্রাকৃতিকভাবে গড়িয়ে নিচে নামার সুযোগ পায় না। নদী সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় এই মাটির জলধারণ ক্ষমতাও অত্যন্ত বেশি। ফলে বৃষ্টির জল দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেকেলে নিকাশী ব্যবস্থা। ব্রিটিশ আমলের বহু ড্রেনেজ লাইন বর্তমানে শহরের বিশাল জনসংখ্যার চাপ নিতে পারছে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এই লাইনগুলোতে পলি জমে জল চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে প্লাস্টিক দূষণ এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। যত্রতত্র ফেলা প্লাস্টিক ব্যাগ ও বোতল নিকাশী নালার মুখে জমে জল নামার পথ আটকে দিচ্ছে। এছাড়া শহর ও শহরতলিতে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল নির্মাণ এবং জলাজমি বুজিয়ে ফেলায় জল শোষণের প্রাকৃতিক পথগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আগে বিস্তীর্ণ জলাভূমিগুলো স্পঞ্জের মতো কাজ করত, যা এখন কংক্রিটের জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। মাটি চুঁইয়ে জল ভূগর্ভে যাওয়ার উপায় না থাকায় তা রাস্তায় জমে থাকছে।
কেএমডিএ-র প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার প্রসূন বিশ্বাসের মতে, কলকাতার অ্যালুভিয়াল মাটি এমনিতে জল শোষণ করে, কিন্তু এখন শহরজুড়ে পিচ ও কংক্রিটের আস্তরণ তৈরি হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া থমকে গিয়েছে। ফলস্বরূপ, জমা জল ড্রেন ছাড়া বের হওয়ার অন্য কোনো পথ পাচ্ছে না। অন্যদিকে নিকাশী ব্যবস্থার পরিকাঠামো মূলত গৃহস্থালীর বর্জ্য বের করার জন্য তৈরি, যা প্রবল বৃষ্টির অতিরিক্ত জল সামলানোর পক্ষে পর্যাপ্ত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো নিকাশী পাইপ পরিবর্তন না করা এবং নিয়মিত ডেসিল্টিং বা পলি পরিষ্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। যে জমিতে আগে মাত্র দু-তিনটি পরিবার থাকত, সেখানে এখন চল্লিশটি পরিবারের বাস। কিন্তু নিকাশী পাইপের ব্যাস আজও অপরিবর্তিত। এই বহুমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধান পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। নতুবা প্রতি বর্ষায় কলকাতাবাসীকে এই জলযন্ত্রণা সহ্য করতেই হবে।