‘পুজো না করলেও আপনি হিন্দু’, শবরিমালা মামলায় বড় বার্তা সুপ্রিম কোর্টের
হিন্দু ধর্ম কি কেবল নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা মন্দির দর্শনের ফ্রেমে বন্দি? শবরীমালা মামলার শুনানিতে এই মৌলিক প্রশ্নের এক তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বুধবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, হিন্দুত্ব আসলে একটি বিশেষ জীবনধারা বা ‘ওয়ে অফ লাইফ’। কোনো ব্যক্তি যদি নিয়মিত মন্দিরে না যান কিংবা প্রচলিত ধর্মীয় প্রথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন না করেন, তবুও তাঁর হিন্দু পরিচয় ক্ষুণ্ণ হয় না।
ধর্মীয় চেতনা বনাম বাহ্যিক আচার
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বে ৯ বিচারপতির বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে বর্তমানে শবরীমালা মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রথাগত বৈধতা নিয়ে শুনানি চলছে। শুনানিকালীন বেঞ্চের অন্যতম সদস্য বিচারপতি বি.ভি. নাগারত্ন এক গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, হিন্দুধর্মের ব্যাপ্তি এতটাই বিশাল যে এখানে বাধ্যতামূলক আচারের চেয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মানসিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেকের বাড়িতে হয়তো আলাদা ঠাকুরঘর নেই বা তাঁরা মন্দিরে যান না, কিন্তু তাঁদের চেতনা ও জীবন দর্শনে তাঁরা হিন্দু। মানুষের এই অন্তর্নিহিত বিশ্বাসে আইনি বা সামাজিক কোনো বাধা থাকতে পারে না বলে আদালত মনে করে।
সংবিধান ও সভ্যতার ভারসাম্য রক্ষা
এদিন শুনানিতে সংস্কার বনাম প্রাচীন প্রথার আইনি লড়াই বেশ জোরালো হয়ে ওঠে। মামলাকারীর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয় যে, সংবিধানের ২৫ ও ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় অধিকার কখনোই লিঙ্গ সাম্য ও মানবিক মর্যাদাকে লঙ্ঘন করতে পারে না। তবে বিচারপতিরা ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। বিচারপতি নাগারত্ন প্রশ্ন তোলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সংবিধান প্রণেতারা দীর্ঘ বিতর্কের মাধ্যমে একটি সভ্যতার ভিত গড়েছিলেন; আজকের বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপে কি সেই প্রাচীন সভ্যতার মূল কাঠামোটি নাড়িয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত হবে?
আদালত আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, যদি প্রতিটি ধর্মীয় বিশ্বাস বা প্রথাকে বিচারবিভাগীয় আতশ কাঁচের নিচে আনা হয়, তবে ভবিষ্যতে হাজার হাজার জনস্বার্থ মামলা জমা পড়বে। এতে ধর্মের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ২০১৮ সালে শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী মহিলাদের প্রবেশের অনুমতি দিয়ে যে রায় দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে ৯ বিচারপতির এই বৃহত্তর বেঞ্চে তার পুনর্বিবেচনা চলছে। বুধবারের এই পর্যবেক্ষণ সেই আইনি প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং উদারপন্থী ব্যাখ্যা যোগ করল।