হার্ট অ্যাটাকের পর মস্তিষ্ক কি সত্যিই বেঁচে থাকে?

বর্তমান ডেস্কঃ

মানুষের মৃত্যু মানেই কি সব শেষ? দীর্ঘকাল ধরে এই প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। সাধারণত হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়াকেই আমরা মৃত্যু বলে ধরে নিই, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। মৃত্যু কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি মন্থর প্রক্রিয়া। দেহ নিথর হয়ে যাওয়ার বেশ কিছু সময় পর পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে এবং বাইরের শব্দ শুনতে পায়।

মৃত্যুর প্রক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের শেষ লড়াই

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়াকে ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ বলা হয়। হৃদপিণ্ড থেমে যাওয়ার সাথে সাথে মস্তিষ্কে অক্সিজেন এবং রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে নিউরন বা মস্তিষ্কের কোষগুলো তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায় না। অক্সিজেন ছাড়া ৪ থেকে ৬ মিনিটের মধ্যে কোষগুলো মরতে শুরু করে এবং ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয়। গবেষকরা দেখেছেন, এই সময়ের মধ্যেও মস্তিষ্কের কিছু অংশ তার অবশিষ্ট শক্তি ব্যবহার করে সক্রিয় থাকে।

স্মৃতিচারণ ও গামা তরঙ্গের ভূমিকা

২০২২ সালে ৮৭ বছর বয়সী এক রোগীর ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুর ঠিক ৩০ সেকেন্ড আগে এবং পরে মস্তিষ্কে ‘গামা ওয়েভস’ বা গামা তরঙ্গের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে। এই তরঙ্গগুলো সাধারণত গভীর ধ্যান, স্বপ্ন দেখা বা স্মৃতি রোমন্থনের সময় উৎপন্ন হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে মানুষ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো একটি সিনেমার মতো দেখতে পায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘লাইফ রিভিউ’ বলা হয়।

শ্রবণশক্তি মানুষের শেষ অনুভূতি

ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ২০২০ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, শ্রবণশক্তি হলো মানুষের সেই ইন্দ্রিয় যা মৃত্যুর সময় সবচেয়ে শেষে অকেজো হয়। যখন একজন রোগী পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়েন এবং কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতা হারান, তখনও তার মস্তিষ্কের ‘অডিটরি প্রসেসিং সিস্টেম’ বাইরের শব্দে সাড়া দেয়। অর্থাৎ, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও একজন ব্যক্তি তার প্রিয়জনদের কথা, প্রার্থনা বা আশেপাশের শব্দ শুনতে পান।

চেতনা ও নিউরাল অ্যাক্টিভিটি

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে হৃদস্পন্দন থামার ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পর পর্যন্ত মস্তিষ্কের তরঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। একে অনেক সময় ‘ওয়েভ অফ ডেথ’ বলা হয়। এই পর্যায়ে মস্তিষ্ক তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি অঙ্গদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসকরা ‘ব্রেন ডেথ’ নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল পরবর্তী পদক্ষেপ নেন।

বিজ্ঞানীরা এখনও সেই সূক্ষ্ম সীমারেখাটি বোঝার চেষ্টা করছেন যেখানে মানুষের চেতনা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। তবে বর্তমান গবেষণাগুলো শোকাতুর পরিবারগুলোকে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দেয় যে, শেষ বিদায়ের মুহূর্তে তাদের বলা কথাগুলো প্রিয়জনের মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছায়।

এক নজরে

  • মৃত্যু কোনো মুহূর্ত নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
  • হৃদস্পন্দন থামার পর মস্তিষ্ক কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
  • মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের শ্রবণশক্তি কার্যকর থাকে।
  • মৃত্যুর আগে মস্তিষ্কে গামা তরঙ্গের প্রবাহ বাড়ে, যা জীবনের পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
  • অঙ্গদানের ক্ষেত্রে হৃদপিণ্ড নয় বরং মস্তিষ্কের মৃত্যু বা ‘ব্রেন ডেথ’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *