মার্কিন ইরান যুদ্ধবিরতির নেপথ্যে বড় চাল চিনের

দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা আমেরিকা ও ইরান সংঘাতের আবহে অবশেষে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে। দুই দেশই দুই সপ্তাহের জন্য লড়াই থামিয়ে শান্তি প্রক্রিয়ায় ফিরতে সম্মত হয়েছে। তবে এই সমঝোতার নেপথ্যে পাকিস্তানের চেয়েও বড় কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে চিনের নাম। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চিনের এই সক্রিয় ভূমিকার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন।

নেপথ্যে চিনের কুশলী কূটনীতি

চিন সরাসরি এই ইস্যুতে সামনে না এলেও পর্দার আড়ালে অত্যন্ত শক্তিশালী কূটনৈতিক চাল দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান ও মিশরের মাধ্যমে ইরানকে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে ড্রাগনের দেশ। চিনের প্রধান যুক্তি ছিল, এই যুদ্ধ চলতে থাকলে তা কেবল ইরান নয়, বরং গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবে। তেহরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর পেছনে এই অর্থনৈতিক চাপের কৌশলটি বেশ কার্যকর হয়েছে।

চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণের পরামর্শ দিয়ে সংঘাত মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সরকারিভাবে চিন একে ‘শান্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টা’ বললেও বিশ্লেষকদের মতে এটি মূলত আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি প্রক্রিয়া।

হরমুজ প্রণালী ও ভেটো রাজনীতি

যুদ্ধবিরতির ঠিক আগেই রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিজেদের প্রভাব জাহির করেছে চিন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ইস্যুতে রাশিয়ার সঙ্গে মিলে চিন ভেটো প্রদান করে। এর ফলে আমেরিকার আনা প্রস্তাব আটকে যায়। ওয়াশিংটন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দাবি করেছে, চিন ও রাশিয়া গোপনে ইরানের পক্ষ নিয়েছে।

চিনের এই দ্বিমুখী কৌশল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে তারা শান্তি স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের দায়িত্বশীল বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে জোট বেঁধে মার্কিন আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

পাকিস্তান নাকি চিন কার ক্রেডিট বেশি

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন যে পাকিস্তানের মাধ্যমেই ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। তবে কূটনীতিকদের মতে, পাকিস্তান কেবল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করলেও মূল পরিকল্পনার রূপকার ছিল চিন। চিনের সমর্থন ও পরামর্শ ছাড়া এই পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হতো না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুদ্ধবিরতির প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি

এই যুদ্ধবিরতির ফলে আপাতত হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হচ্ছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটি বড় স্বস্তি। তবে এটি মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য কার্যকর থাকবে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আলোচনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। আপাতত বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়িয়ে আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষকে ফিরিয়ে আনাই এই কূটনৈতিক জয়ের বড় সাফল্য।

একঝলকে

  • যুদ্ধবিরতির মেয়াদ: আমেরিকা ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।
  • প্রধান কারিগর: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, চিনের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমঝোতা সম্ভব ছিল না।
  • চিনের কৌশল: সরাসরি অংশ না নিয়ে পাকিস্তান ও মিশরের মাধ্যমে ইরানকে শান্ত থাকার বার্তা দিয়েছে চিন।
  • অর্থনৈতিক উদ্বেগ: যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামার আশঙ্কায় এই পদক্ষেপ।
  • হরমুজ প্রণালী: যুদ্ধবিরতির ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হচ্ছে।
  • স্থায়ী সমাধান: আপাতত যুদ্ধ থামলেও স্থায়ী শান্তি ফিরবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *