পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ২০২৬ কার পকেটে কত টাকা কোটিপতি থেকে শূন্য আয়ের প্রার্থীদের সম্পত্তির খতিয়ান

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর দামামা বেজে গিয়েছে। রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে একে অপরকে টেক্কা দিতে ব্যস্ত প্রার্থীরা। তবে প্রচারের উত্তাপের মাঝেই সাধারণ মানুষের নজর এখন প্রার্থীদের জমা দেওয়া নির্বাচনী হলফনামার দিকে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মানুযায়ী প্রার্থীদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির খতিয়ান প্রকাশ্যে আসতেই দেখা যাচ্ছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। কেউ কোটিপতি, কারও আবার নিজস্ব আয়ের উৎস পর্যন্ত নেই।

নেতাদের জীবনযাত্রা এবং আয়ের উৎস নিয়ে জনমনে কৌতূহল দীর্ঘদিনের। এবারের নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, আয়ের দিক থেকে যেমন বৈচিত্র্য রয়েছে, তেমনই আয়ের উৎসেও রয়েছে ভিন্নতা। পেশাদার আইনজীবী থেকে শুরু করে লেখক কিংবা পূর্ণসময়ের রাজনীতিক—কার সম্পত্তির পাল্লা কতখানি ভারী, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

হেভিওয়েট প্রার্থীদের সম্পত্তির বিবিধ খতিয়ান

নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তৃণমূল ও বিজেপি উভয় শিবিরের প্রার্থীরাই স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির নিরিখে বেশ জোরালো অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে বাম শিবিরের প্রার্থীরা মেধার লড়াইয়ে এগিয়ে থাকলেও সম্পত্তিতে পিছিয়ে রয়েছেন অনেকক্ষেত্রেই।

  • বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য (CPIM): যাদবপুরের এই হেভিওয়েট প্রার্থীর বার্ষিক আয় যেমন ধারাবাহিক ভাবে বেড়েছে, তেমনই তাঁর মোট অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ২৩ হাজার টাকা। কলকাতায় একাধিক আবাসিক সম্পত্তি মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ আকাশছোঁয়া।
  • ফিরহাদ হাকিম (TMC): গত পাঁচ বছরে ফিরহাদের আয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তাঁর কাছে ৭ কোটি ২৭ লক্ষ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি থাকলেও নিজের নামে কোনও গাড়ি নেই। তবে হলফনামায় ইডি ও সিবিআই মামলার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তিনি।
  • স্বপন দাশগুপ্ত (BJP): রাসবিহারীর বিজেপি প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত এবং সচ্ছল। নয়াদিল্লিতে তাঁর ৫ কোটি টাকার একটি বাড়ি রয়েছে। তাঁর মোট অস্থাবর সম্পত্তি ২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকার বেশি।
  • সুজিত বসু (TMC): বিধাননগরের এই প্রার্থী ছেলে-মেয়ের থেকে ১ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন। তাঁর ২৩ লক্ষ টাকার স্করপিও গাড়ি এবং ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের দুটি বাড়ি রয়েছে।
  • মদন মিত্র (TMC): কামারহাটির প্রার্থীর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ১ কোটি ১১ লক্ষ টাকার বেশি। ১০ লক্ষ টাকার গয়না এবং দুটি বাড়ি মিলিয়ে তাঁর আর্থিক ভিত্তি বেশ মজবুত।
  • সজল ঘোষ (BJP): বরানগরের এই বিজেপি প্রার্থীর মোট অস্থাবর সম্পত্তি ২ কোটি ৬ লক্ষ টাকার বেশি। নিজস্ব গাড়ি না থাকলেও ১ কোটি ৮৩ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি বাসভবন রয়েছে তাঁর।

ব্যতিক্রমী কুণাল ও লড়াকু সায়ন

তৃণমূলের কুণাল ঘোষের আয়ের উৎসগুলি বেশ বৈচিত্র্যময়। তিনি বেতন, বই বিক্রির লভ্যাংশ এবং অভিনয় থেকে আয় করেন। তাঁর কাছে ১ কোটি ৭২ লক্ষ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি থাকলেও কোনও বাড়ি বা স্থাবর সম্পত্তি নেই। অন্যদিকে, মহেশতলার তরুণ বাম প্রার্থী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে দুটি গাড়ি থাকলেও নেই কোনও সোনাদানা। তবে তাঁর ২৩ লক্ষ টাকার পৈতৃক জমি রয়েছে।

শূন্য আয়ের প্রার্থী ও দলীয় ভাতা

ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছেন পানিহাটির বাম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত। তাঁর ব্যক্তিগত কোনও আয় নেই এবং তিনি আয়ের ঘরে ‘শূন্য’ উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক দলের ‘হোলটাইমার’ হিসেবে দলীয় ভাতার ওপর নির্ভরশীল এই প্রার্থীর সংসার চলে স্ত্রীর উপার্জনে। তাঁর মোট অস্থাবর সম্পদ মাত্র ২.৯ লক্ষ টাকা।

একঝলকে প্রার্থীদের সম্পদের চিত্র

  • সবচেয়ে বেশি অস্থাবর সম্পত্তি: বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য (প্রায় ১৪ কোটি টাকা)।
  • সবচেয়ে দামি আবাসন: স্বপন দাশগুপ্ত (নয়াদিল্লিতে ৫ কোটির বাড়ি)।
  • গাড়ি নেই যাদের: ফিরহাদ হাকিম, সজল ঘোষ ও কুণাল ঘোষ।
  • ঋণগ্রস্ত প্রার্থী: সুজিত বসু (সন্তানদের থেকে ১ কোটির বেশি ঋণ)।
  • শূন্য আয়ের প্রার্থী: কলতান দাশগুপ্ত (দলীয় ভাতার ওপর নির্ভরশীল)।
  • সোনা নেই কার: সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীদের এই হলফনামা কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব নয়, বরং এটি তাঁদের সামাজিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক জীবনযাত্রার একটি প্রতিফলন। সাধারণ ভোটাররা এই তথ্যগুলো বিচার করেই তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, এই সম্পত্তির খতিয়ান যে জনমতামতে প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *