নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে চরম অপমান ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে ক্ষুব্ধ তৃণমূল

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যবহারের প্রতিবাদে দিল্লির দরবারে সরব হল তৃণমূল কংগ্রেস। অভিযোগ উঠেছে, বুধবার নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তৃণমূলের প্রতিনিধি দলকে মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে ‘গেট লস্ট’ বলে বের করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরাসরি অশালীন আচরণের অভিযোগ তুলেছে জোড়াফুল শিবির।

বৈঠকের নেপথ্যে ক্ষোভের কারণ

তৃণমূলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকার সংশোধনী প্রক্রিয়ায় রাজ্যে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। এই বিষয়ে তথ্য ও যুক্তি পেশ করতে ডেরেক ও ব্রায়েন, সাগরিকা ঘোষ, মানেকা গুরুস্বামী এবং সাকেত গোখলের চার সদস্যের এক প্রতিনিধি দল কমিশনের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ডেরেক ও’ব্রায়েনের দাবি, কমিশনার তাঁদের কোনো কথা শুনতেই রাজি হননি, বরং কার্যত অপমানজনকভাবে বৈঠক থেকে বের করে দেন।

বাদ পড়া ভোটারের পরিসংখ্যান ও বিতর্ক

ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই শাসক দল অনিয়মের অভিযোগ তুলে আসছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সংঘাতের মূল কারণগুলি হলো:

  • ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় প্রথমে প্রায় ৬৬ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল।
  • অতিরিক্ত ৬০ লক্ষ নাম ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা যাচাইয়ের স্তরে ছিল।
  • সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ওই ৬০ লক্ষের মধ্যে থেকেও আরও ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার নাম বাতিল করা হয়েছে।
  • সব মিলিয়ে বর্তমান বাদ পড়া ভোটারের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯১ লক্ষে।

রাজনৈতিক সংঘাত ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের সরিয়ে দেওয়া এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তাঁদের অভিযোগ, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে এই পরিকল্পনা করেছে যাতে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করা যায়। শাসক শিবিরের মতে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যাচাইয়ের কথা থাকলেও সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ছিটেফোঁটাও নেই।

এর আগেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একই ধরনের অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলেছিলেন। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আগে কমিশনকে ‘অহঙ্কারী’ আখ্যা দিয়ে বৈঠক বয়কট করার পথে হেঁটেছিলেন। বুধবারের এই ঘটনা সেই তিক্ততাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেল।

ভোটার অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা নিয়ে এই জটিলতা সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে। একদিকে বিশাল অংকের মানুষের নাম বাদ যাওয়া এবং অন্যদিকে কমিশনের অনমনীয় মনোভাব পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। নির্বাচনের আগে কমিশন বনাম রাজ্য শাসক দলের এই সংঘাত আদতে সাধারণ ভোটারদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

একঝলকে

  • নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তৃণমূল প্রতিনিধি দলকে ‘গেট লস্ট’ বলার অভিযোগ।
  • তৃণমূল প্রতিনিধি দলে ছিলেন ডেরেক ও ব্রায়েন, সাগরিকা ঘোষ, মানেকা গুরুস্বামী ও সাকেত গোখলে।
  • ভোটার তালিকা থেকে রাজ্যে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়ায় তীব্র অসন্তোষ।
  • তৃণমূলের দাবি, এটি বিজেপি ও কমিশনের একটি ‘যৌথ ষড়যন্ত্র’।
  • অতীতেও কমিশনারের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *